আঠারবাড়ী

সঞ্চয় ও সহযোগিতা, কৃষি ও ব্যাবসা সংবাদ

পেঁপের চাষ

5 টি মন্তব্য

পরিচিতি

পেঁপে বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান ফল, যা সবজি হিসেবেও খাওয়া যায় এবং সারা বছরই পাওয়া যায়। পেঁপের পুষ্টিমাণ অনেক হওয়ায় মানব দেহের রোগ প্রতিরোধে এটি ভালো ভমিকা রাখে। কথায় আছে ‘দৈনিক একটি করে পেঁপে খাও, ডাক্তার বৈদ্য দূরে তাড়াও’। পেঁপে গাছের পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা গাছে থাকে। পুরুষ ফুলের বোঁটা লম্বা এবং ঝুলে থাকে এবং স্ত্রী ফুল বোঁটাহীন হয়। দেশের বিভিন্ন স্হানে পেঁপে ব্যবসায়িকভাবে চাষ হয়ে থাকে। বর্তমানে ৫৪২০ একর জমিতে ১২৩৭০ মেট্রিকটন পেঁপের চাষ করা হয়। পেঁপের ইংরেজি নাম Papaya এবং বৈজ্ঞানিক নাম Carica Papaya.
পুষ্টিমাণ পেঁপের প্রতি ১০০ গ্রামে নিম্নলিখিত পুষ্টি রয়েছে-
উপাদান
পরিমাণ
কাঁচা পেঁপে
পাকা পেঁপে
জলীয় অংশ
৯০.৭
৮৮.৪ গ্রাম
মোট খনিজ পদার্থ
১.৩
০.৭ গ্রাম
আঁশ
০.৯
০.৮ গ্রাম
খাদ্য শক্তি
৩৬
৪২ কিলোক্যালরী
আমিষ
০.৯
১.৯ গ্রাম
চর্বি
০.৮
০.২ গ্রাম
শর্করা
৬.৪
৮.৩ গ্রাম
ক্যালসিয়াম
১৩
৩১ মিলিগ্রাম
আয়রন
০.৯
০.৫ মিলিগ্রাম
ক্যারোটিন
৫৬০
৮১০০ মাইক্রোগ্রাম
ভিটামিন-বি-১
০.৪০
০.০৮ মিলিগ্রাম
ভিটামিন-বি-২
০.০২
০.০৩ মিলিগ্রাম
ভিটামিন-সি

৫৭ মিলিগ্রাম
সূত্র: পেঁপের পুষ্টিমাণ ও ব্যবহার, বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (বারটান)

যে সব জায়গায় বেশি পরিমাণে চাষ হয় বৃহত্তর রাজশাহী, পাবনা, রংপুর, নাটোর, যশোর, নরসিংদী, খুলনা এলাকায় পেঁপে চাষ হয়। এছাড়াও বগুড়ার লাঠিগঞ্জ, গাবতলী উপজেলা, নামুজা, বগুড়া সদর, শিবগঞ্জ-এর গুজিয়া, আইলাঘাট, মোকামতলা পেঁপে চাষের জন্য সুপরিচিত।

জাত
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইস্টিটিউট ১৯৯২ সালে উন্নত গুণাগুণ সম্পন্ন উচ্চ ফলনশীল একটি পেঁপের জাত আবিষ্কার করেছে। এ জাতটির নাম “শাহী” যা “বারি পেঁপে-১” নামেও পরিচিত।
বৈশিষ্ট্য

আকার: শাহী পেঁপে ১.৬ থেকে ২.০ মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট বহুবর্ষী (বহু বছর বাঁচে যে গাছ) গাছ। কান্ডের খুব নীচু থেকে ফল ধরে। ফল আকৃতি ডিমের মতো । ওজন: ৮৫০ থেকে ১০০০ গ্রাম। শাসের রং: গাঢ় কমলা এবং পুরুত্ব ১ ইঞ্চি (প্রায় ২ সেমি)। বীজের সংখ্যা: ফল প্রতি বীজের সংখ্যা ৫০০ থেকে ৫৫০ টি। ফলের সংখ্যা: গাছ প্রতি ফলের সংখ্যা ৪০ থেকে ৬০টি। ফলের টিএসএস ১২%। ফলন: ১ হেক্টর জমি থেকে ৫০ টন পর্যন্ত পেঁপে পাওয়া যায়।
এছাড়া ওয়াশিংটন, হানিডিউ, রাঁচি, ইত্যাদি জাতের চাষ হয়ে থাকে। পুষাজায়েন্ট, পুষা ম্যাজেষ্টি, সলো ইত্যাদি জাতগুলো উল্লেখযোগ্য।

পেঁপে চাষে কি লাভ? • স্বল্প সময়ে ফল পাওয়া যায়; • এটা বেশি লাভজনক: • এটির পুষ্টিগুণ খুব বেশি: • রমজান মাসে এর চাহিদা অনেক বেশি হয়; • খরচ খুব কম, এক বিঘাতে (৩৩ শতাংশ) মাত্র ৬০০০ টাকা খরচ হয়: • পেঁপের সাথে পেঁয়াজ, মরিচ, পুইশাঁক ও লালশাক করা যায়; • কাঁচা অবস্হায় তরকারী এবং পাকা অবস্হায় ফল হিসাবে খাওয়া যায়।

স্হান নির্বাচন/চাষের জন্য পরিবেশ ও মাটি/জমি তৈরি
স্হান নির্বাচন পানি দাঁড়াতে পারেনা এমন উর্বর জমি পেঁপের জন্য নির্বাচন করতে হয়। সাধারণত: উঁচু ও মাঝারী উঁচু জমি পেঁপে চাষের জন্য ভাল।

চাষের জন্য পরিবেশ ও মাটি
জলবায়ু
তাপমাত্রা
মাটির ধরন
উষ্ণ ও আদ্র আবহাওয়ায় পেঁপে ভাল জন্মে, কুয়াশা ও শীতে পেঁপে চাষে খুব সমস্যা হয়। পাতাসহ গাছ পচে যায়।
২১ থেকে ৩০ ডিগ্রী সে. তাপমাত্রা পেঁপের বৃদ্ধির জন্য ভাল। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় পেঁপে সবখানে লাভজনকভাবে চাষ করা যেতে পারে।
এঁটেল মাটিতে (লাল মাটি) পেঁপে খুব ভাল চাষ হয়। এঁটেল মাটিতে চাষকৃত পেঁপে খুব মিষ্টি হয়। তবে সঠিকভাবে যত্ন নিলে প্রায় সব ধরনের মাটিতেই পেঁপের চাষ করা যায়।
জমি তৈরি জমি ভালোভাবে চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুরা করে সমতল করতে হবে ও পানি সরে যাওয়ার জন্য নালা রাখতে হবে যাতে করে জমিতে পানি আটকে না থাকে।

রোপণ পদ্ধতি ও রোপণ সময়
রোপণ পদ্ধতি

পেঁপের জন্য প্রচুর সূর্যের আলো প্রয়োজন। এ জন্য চার হাত দূরত্বে কাঠি পুঁতে রোপণের জায়গা চিহ্নিত করতে হবে। তারপর কাঠিটিকে কেন্দ্র করে এক হাত গভীর ও এক হাত উচ্চতার গর্ত তৈরি করে গর্তে সার ও মাটি মিশিয়ে চারা রোপণের উপযুক্ত করতে হবে। প্রতি গর্তে ৩ থেকে ৭টি করে চারা চার হাত দূরত্বে তিনকোনা আকারে রোপণ করতে হয়। একরে প্রায় ১৩৫০ থেকে ১৫০০ টি চারার প্রয়োজন হয়।

রোপণ সময় বছরের যে কোন সময় পেঁপে রোপণ করা যায়। সেচের সুবিধা থাকলে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর অথবা জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে রোপণ করা যায় অথবা মৌসুমী বৃষ্টি শুরু হলে মে মাসে রোপণ করা ভাল। তবে মার্চের প্রথম সপ্তাহে পেঁপের চারা লাগাতে হয়। ৩৫ থেকে ৪০ দিন বয়সের চারা লাগানো ভাল।
আন্তঃপরিচর্যা
আন্তঃপরিচর্যা পেঁপে বাগান আগাছামুক্ত রাখতে হবে। শুকনো মৌসুমে ১৫ থেকে ২০ দিন পরপর সেচ দিতে হয়। মাটি মাঝে মাঝে হালকা কুপিয়ে দেয়া ভাল। রোপণের ৪ থেকে ৫ মাস পর থেকেই ফুল আসা শুরু করে। ফুল দেখে কোনটি স্ত্রী গাছ কোনটি পুরুষ গাছ চেনা যায়। গোল ফুল মেয়ে গাছ ও লম্বা ঝোপা ফুল হবে পুরুষ গাছ। এ সময় প্রতি গর্তে একটি করে স্ত্রী গাছ রেখে আর সব গাছ সে স্ত্রী হোক বা পুরুষ হোক তুলে ফেলতে হবে। তবে প্রতি ২০টি গাছের জন্য একটি করে পুরুষ গাছ রাখতে হয় যাতে পরাগায়ণে সুবিধা হয়। শতকরা ৫টি পুরুষ গাছ জমিতে রাখতে হয়। একরে ৭৫টি পুরুষ গাছ রাখা প্রয়োজন।

সেচ ব্যবস্হা ১. সেচ নালায় দিতে হবে। ২. যাতে কোন ভাবেই গাছের গোড়ায় সেচ না যায়। গাছ থেকে ৬ ইঞ্চি দূরত্বে পানি সেচ দিতে হবে। ৩. বর্ষার সময় নালা থেকে পানি বের করে দিতে হবে।

সারের মাত্রা ও প্রয়োগ
সারের নাম
মোট পরিমাণ (গাছ প্রতি)
শেষ চাষের সময় দেয়
গর্তে দেয়
পরবর্তী পরিচর্যা হিসেবে দেয়
নতুন পাতা আসলে
ফুল আসলে
১ম কিস্তি
২য় কিস্তি
৩য় কিস্তি
১ম কিস্তি
২য় কিস্তি
৩য় কিস্তি
গোবর
১২ কেজি
৬ কেজি
৬ কেজি






ইউরিয়া
৪৫০ গ্রাম


৫০ গ্রাম
৫০ গ্রাম
৫০ গ্রাম
১০০ গ্রাম
১০০ গ্রাম
১০০ গ্রাম
টিএসপি
৪৫০ থেকে ৫৫০ গ্রাম

সব






এমওপি
৪৫০ গ্রাম


৫০ গ্রাম
৫০ গ্রাম
৫০ গ্রাম
১০০ গ্রাম
১০০ গ্রাম
১০০ গ্রাম
জিপসাম
২৪০ গ্রাম

সব






বোরাক্স
২০ থেকে ৩০ গ্রাম

সব






জিংক সালফেট
১৫ থেকে ২০ গ্রাম

সব





পোকামাকড় ও রোগবালাই
রোগবালাই
রোগের নাম
লক্ষণ
প্রতিকার
ড্যাম্পিং অফ বা চারা পচা রোগ

মাটিতে যে ছত্রাক থাকে তার দ্বারা এ রোগ হতে পারে। এ রোগটি সাধারণত: চারা অবস্হায় অথবা বীজ গজানোর সময় হয়ে থাকে। বীজের অংকুর গজানোর সময় এ রোগের জীবাণু অতি সহজেই বীজ অথবা অংকুরকে আক্রমণ করে। এ অবস্হায় বীজ পচে যায় এবং চারা মাটির উপর বের হয়ে আসতে পারেনা। এভাবে অংকুর গজানোর আগেই পচন হতে পারে। চারা গজানোর পরেও জীবাণুর আক্রমণ ঘটে। এ পর্যায়ে চারার গোড়া বা শিকড় পচে গিয়ে আক্রান্ত চারা মাটিতে পড়ে যায় এবং মারা যায়। চারার বয়স বাড়ার সাথে সাথে এ রোগের প্রকোপ কমে যায়।
১. বীজতলার জন্য উঁচু, পানি জমে না, এমন দো-আঁশ মাটির জমি নির্বাচন করা। ২. বীজ লাগানোর আগে বীজতলা কাঠের গুঁড়া, খড় ইত্যাদি দিয়ে পুড়িয়ে নিতে হবে অথবা প্রতি লিটার পানির সাথে ১০ মিলি ফরমালিন মিশিয়ে মাটি ভিজিয়ে শোধন করে নিতে হবে। ৩. বীজ লাগানোর আগে প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম হারে ভিটাভেক্স-২০০ নামক ছত্রাকনাশক দিয়ে বীজ শোধন করে নিতে হবে। ৪. রোগ দেখা মাত্রই রিডোমিল গোল্ড, ডায়থেন এম-৪৫ অথবা নুবেন নামক ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে অথবা স্টীল প্রতি ১৬ লিটার পানিতে ৫ মিলি হারে মিশিয়ে বীজতলার মাটি ভাল করে ভিজিয়ে দিতে হবে। ৫. রোগাক্রান্ত জমি পরবর্তীতে ২ থেকে ৩ বছর আর বীজ তলার জন্য নির্বাচন করা যাবে না।
কলার রট/কান্ড পচা/গোড়াপচা রোগ

মাটিতে যে ছত্রাক থাকে তার দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে। গাছের গোড়ার অংশে এ রোগ হয়ে থাকে। প্রথমে মাটি বরাবর কান্ডের গায়ে পানি ভেজা দাগ দেখা যায়। ক্রমে এ দাগ বড় হয়ে কান্ডকে ঘিরে ফেলে এবং আক্রান্ত অংশ পচে যায়। এ অবস্হায় গাছের পাতা হলুদ হয়ে নেতিয়ে পড়ে, গাছ হেলে পড়ে, আক্রান্ত অংশ ভেঁঙ্গে মাটিতে পড়ে যায় এবং এক পর্যায়ে গাছটি মারা যায়।
১. পেঁপে চাষের জন্য উঁচু, ছায়ামুক্ত, পানি জমে থাকে না এবং পানি বের করার ব্যবস্হা ভাল এমন জমি নির্বাচন করতে হবে। ২. আক্রান্ত গাছ তুলে ধ্বংস করে ফেলতে হবে। ৩. আক্রান্ত গাছের গোড়ার মাটি ম্যানকোজেব জাতীয় ছত্রাকনাশক (প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে) দিয়ে ১৫ দিন পরপর ২ থেকে ৩ বার ভিজিয়ে দিতে হবে। ৪. যে জমিতে এ রোগ দেখা যাবে সে জমিতে পরবর্তীতে ২ থেকে ৩ বছর পেঁপে চাষ করা যাবে না।
ফল পচা রোগ

একাধিক ছত্রাকের কারণে এ রোগ হতে পারে। এ রোগের কারণে পেঁপে পচে যায়। প্রাথমিক অবস্হায় ফলের গায়ে কালচে বাদামী রংয়ের দাগ দেখা যায়। ক্রমে এসব দাগ বড় হতে থাকে এবং আক্রান্ত অংশ নরম হয়ে পচন ধরে। এ অবস্হায় ক্ষত স্হানটিতে বসে যাওয়া ভাব দেখা যায়। অনেক সময় ক্ষত স্হানটিতে সাদা তুলার মত ছত্রাক লেগে থাকতে দেখা যায়।
১. গাছে ফলে যেন কোন প্রকার ক্ষত না হয় সেদিকে সাবধান থাকতে হবে। ২. গাছ হতে ফল পাড়ার সময় ফলে যাতে আঘাত না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ৩. গাছে আক্রমণের হার বেশি হলে রিডোমিল গোল্ড নামক ছত্রাক নাশক (প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে) ১৫ দিন পর পর ২ থেকে ৩ বার স্প্রে করতে হবে।
পেঁপের শিকড়ে গিট রোগ

এক প্রকার কৃমির আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে। এ রোগ গাছের শিকড়ে আক্রমণ করে যার ফলে শিকড়ের স্বাভাবিকভাবে না বেড়ে অসংখ্য গিটের সৃষ্টি করে। এ অবস্হায় গাছের শিকড় নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফলে গাছ মাটি হতে প্রয়োজনীয় পানি এবং খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে না। এতে গাছের বৃদ্ধি কমে যায়, গাছ হলুদ হয়ে যায় এবং নেতিয়ে পড়ে। গাছের পেঁপের সংখ্যা কমে যায় এবং পেঁপের আকৃতি ছোট হয়ে যায়।
১. যে সব জমিতে আগে পেঁপে বা অন্যান্য ফসলে এই রোগ দেখা দিয়েছে সে সব জমিতে পেঁপে চাষ না করে কপি, মুলা, ভূা ইত্যাদির সাহায্যে ২ থেকে ৩ বছর শস্যপর্যায় অবলম্বন করতে হবে। ২. পেঁপে গাছ লাগানোর ১ মাস পরে প্রতি একরে জমিতে ২৪২৯ থেকে ৩২৩৮ কেজি হারে মুরগীর বিষ্টা জমিতে প্রয়োগ করে তা হালকা সেচের মাধ্যমে জমিতে পচিয়ে নিতে হবে। ৩. পেঁপে গাছ লাগানোর সময় প্রতি মাদাতে ১০ গ্রাম পরিমাণ ফুরাডান ৫জি নামক কৃমি নাশক প্রয়োগ করতে হবে এবং ৩ থেকে ৪ মাস পর পর পুনরায় প্রয়োগ করতে হবে।
পেঁপের রিং স্পট রোগ

এক প্রকার ভাইরাসের দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে। প্রাথমিক অবস্হায় এ রোগের লক্ষণ পাতায় প্রকাশ পায়। আক্রান্ত গাছের পাতা হলুদ হয়ে যায়, পাতাগুলো গভীরভাবে খাজকাঁটা ভাব ধারণ করে এবং সরু হয়ে যায়। এ অবস্হাতে ‘সু-ষ্ট্রিং’ বলে। গাছের কান্ড ও পাতার বোঁটায় লম্বাটে তেলতেলে দাগ দেখা যায়। ফলে এ রোগের সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখা দেয়। ফলের গায়ে অসংখ্য রিং এর মত দাগ পড়ে, ফল ছোট ও বিকৃত হয়ে যায়। ফলন কমে যায়। চারা অবস্হায় গাছ আক্রান্ত হলে ফুল হয় না।
১. সুস্হ গাছ হতে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। ২. রোগাক্রান্ত গাছ দেখা যাওয়ার সাথে সাথে কেটে ধ্বংস করে ফেলতে হবে। ৩. একই সাথে বা কাছাকাছি লাউ জাতীয় ফসলের চাষ করা যাবে না। ৪. নিয়মিতভাবে সুমিথিয়ন ইত্যাদি কীটনাশক ঔষধ ১৬ লিটারে ১৫ মিলি হারে মিশিয়ে স্প্রে করে জাবপোকা বা বাহক পোকা দমন করতে হবে।

ফসল সংগ্রহ/ফলন/ফলের যত্ন/মোড়কীকরণ/ফসল সংগ্রহের পর করণীয়
ফসল সংগ্রহ ফল ধরার দু’মাস পরেই সবজি হিসেবে এগুলো বাজারজাতকরণের জন্য সংগ্রহ করা যেতে পারে। পাকা খাওয়ার জন্য যখনই পেঁপের গায়ে একটু হলুদ রং দেখা দেয় তখনই সংগ্রহ করা উচিত। গাছের সব পেঁপে একসাথে সংগ্রহ করা যায় না। যখন যে ফলের রং হলুদ হবে তখনই সেটি সংগ্রহ করতে হয়। এ অবস্হায় সংগ্রহ করলে পেঁপে সম্পূর্ণ পাকতে ৩ থেকে ৪ দিন সময় নিয়ে থাকে। সংগ্রহের পর ফলগুলো এক সারিতে খড়ের ওপর রেখে খড় দিয়ে ঢেকে রাখলে সমানভাবে পাকে। ফল ধরার ৯০ থেকে ১০০ দিনের মধ্যে ফল সংগ্রহের উপযুক্ত হয়ে থাকে।

ফলন পেঁপের ফলন গাছ প্রতি ৩০ থেকে ৬০ কেজি ।

ফলের যত্ন পেঁপে গাছের প্রতি পর্বে ফল আসে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিপর্বে একটির পরিবর্তে এক সাথে বেশ ক’টি ফল আসে এবং এগুলো সঠিকভাবে বাড়তে পারে না। এসব ক্ষেত্রে ছোট অবস্হাতেই প্রতিপর্বে দু’একটি ফল রেখে বাকি সব ফল ভেঁঙ্গে ফেলতে হয়।

মোড়কীকরণ ঝাকিতে খড় বিছিয়ে ১ ইঞ্চি পরিমাণ উঁচু করে পেঁপে পেপার দিয়ে মুড়িয়ে সারি সারি করে বিছিয়ে রেখে বাজারজাত করা যায়।

ফসল সংগ্রহের পর করণীয় • ফসল তোলার পর পেঁপে মাটিতে রাখা যাবে না; • ঝাকি কিংবা পেঁপে গাছের পাতা ছিঁড়ে তার উপর রাখতে হবে। এটা হলো পাকা পেঁপের ক্ষেত্রে, কাঁচার ক্ষেত্রে কোন সমস্যা নেই।

সংরক্ষণ পদ্ধতি/বংশ বিস্তার/বিকল্প ব্যবহার/অধিক ফলনের জন্য পরামর্শ
সংরক্ষণ পদ্ধতি • চটের ছালা মাটিতে বিছিয়ে ২ থেকে ৩ দিন পাকা পেঁপে রাখা যাবে; • কাঁচা পেঁপে ৩ দিন পর্যন্ত রাখা যায়; • পানিতে ভিজিয়ে কাঁচা পেঁপে ৪ থেকে ৫ দিন রাখা যায়।

বীজ সংরক্ষণ পাকা পেঁপের বীজ যেগুলো গোল ও বড় আকৃতির সেগুলো থেকে বীজ বের করে পানিতে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে পলিথিন ব্যাগে রাখা যায়। এভাবে এক বছর রাখা যায়।

বংশ বিস্তার পেঁপের বংশবিস্তার বীজ দ্বারাই হয়। তবে বিশেষ কোন জাত সংরক্ষণ ও আবাদ করতে চাইলে নিয়ন্ত্রিত পরাগায়ণের মাধ্যমে (হাতের সাহায্যে স্ত্রী ফুলটিকে পুরুষ ফুলের সাথে ঘষে দেওয়া) বীজ উৎপাদন করা উচিত। বীজের গায়ে যে পিচ্ছিল পদার্থ থাকে তা অঙ্কুরোদগম (বীজ বের হওয়া) রোধ করে। সুতরাং পাকা ফল থেকে বীজ সংগ্রহের পর ছাইয়ের সাথে মিশিয়ে পাটের বস্তার উপর ঘষে পানিতে ধুলে পিচ্ছিল পদার্থ চলে যায়। এর পরপরই বীজ রোপণ করলে দু’সপ্তাহের মধ্যে চারা বের হয়। অথবা বীজ পরিষ্কার করার পর ভালোভাবে শুকিয়ে ছিদ্রহীন এবং বাতাস ঢুকতে পারে না এমন পাত্রে সংরক্ষণ করলে অনেক বছর ধরে বীজ ভাল থাকে। সংরক্ষণ করা বীজের অংকুরোদগম হতে দুই থেকে চার সপ্তাহ সময় নেয়। বীজতলায় বীজ না ফেলে সরাসরি ছোট ছোট পলিব্যাগেও রোপণ করা হয়। প্রতি পলিব্যাগে ৪ থেকে ৫ টি বীজ ফেলা হয় এবং বীজ গজানোর পর ৩ টি চারাকে বাড়তে দিতে হয়। যেহেতু এদেশের সব পেঁপে জাতই একলিঙ্গী (হয় পুরুষ নয়তো স্ত্রী) এবং চারা অবস্হায় কোনটা স্ত্রী গাছ বা কোনটা পুরুষ গাছ চেনা যায় না, সেহেতু ৩টি চারা রাখার পরামর্শ দেয়া হয়। যাতে করে ৩টির মধ্যে অন্তত: ১টি স্ত্রী গাছ পাওয়া যায়। বীজ তলায় চারা উৎপাদনের বেলায় ৪ থেকে ৬ ইঞ্চি (১০ থেকে ১৫ সেমি) উঁচু ৩×১০ ফুট আকারের বীজতলা তৈরি করতে হয়। বীজ তলার মাটির মিশ্রণ হবে তিন ভাগের এক ভাগ জৈব সার, তিন ভাগের এক ভাগ বালি এবং তিন ভাগের এক ভাগ মাটি। এর সাথে ৫০০ গ্রাম টিএসপি সার মিশালে ভাল হয়। এরকম বীজতলায় ১/২ ইঞ্চি (১ সেমি) মাটির গভীরে বীজ ফেলার পর ঝরনা দিয়ে পানি দিতে হয়। চারা না গজানো পর্যন্ত বীজতলা ৬ ইঞ্চি (১৫ সেমি) উঁচু করে খড় দিয়ে ঢেকে দেয়া ভাল। ২ থেকে ৩ সপ্তাহের মধ্যে চারা বের হয়। বীজ বপনের পর ৫০ থেকে ৬০ দিনের বয়সের চারা জমিতে রোপণের উপযুক্ত হয়। সাধারণত: জুন-জুলাই এবং অক্টোবর-নভেম্বর মাস পেঁপের চারা উৎপাদন সময়। এক একর জমিতে রোপণের জন্য প্রায় ৮০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়।

বিকল্প ব্যবহার • সবজি/তরকারী/ভাজি; • সালাদ; • ইফতারী (পাকা পেঁপে); • পেঁপেনী ইত্যাদি।

অধিক ফলনের জন্য পরামর্শ • নিয়মিত সার দিতে হবে। • ভাল চারা রোপণ করতে হবে। • ভিটামিন জাতীয় ঔষধ দিতে হবে।
আয়-ব্যয় হিসাব
খরচের বিবরণ
শ্রম দিবস (শ্রমিক সংখ্যা)
মজুরী হার (টাকা)
ব্যয় (টাকা)
ক. শ্রমিক বাবদ ব্যয়



১. জমি তৈরি, গর্ত তৈরি ও আগাছা বাছাই
১০
১০০.০০
১০০০.০০
২. বীজ বপন
১৮
১০০.০০
১৮০০.০০
৩. নিড়ানী, গাছের গোড়ায় মাটি ও আইল তোলা
১৮
১০০.০০
১০০০.০০
৪. সার ও কীটনাশক প্রয়োগ

১০০.০০
৬০০.০০
৫. ফসল তোলা
১৮
১০০.০০
১৮০০.০০
ক. মোট ব্যয়


৭০০০.০০
খ. উপকরণ বাবদ
পরিমাণ
মূল্য (টাকা)
ব্যয় (টাকা)
ব্যয়



১. চারা
৫৫০ টি
২.০০/চারা
১১০০.০০
২. গোবর
৪৫০০ কেজি
০.৭৫/কেজি
৩৩৭৫.০০
৩. জৈব সার
৪৫০ কেজি
৬.০০
২৭০০.০০
৪. রাসায়নিক সার
ইউরিয়া ১৫০ কেজি
টাকা ৬.০০/কেজি
৯০০.০০
টিএসপি ১৫০ কেজি
২০.০০/কেজি
৩০০০.০০
এমওপি ১৫০ কেজি
১৭.০০/কেজি
২৫৫০.০০
জিপসাম ৯০ কেজি
৭.০০/কেজি
৬৩০.০০
দস্তা ৯ কেজি
১৬৫.০০/কেজি
১৪৮৫.০০
বোরাক্স ৯ কেজি
১১০.০০/কেজি
৯৯০.০০
৫. সেচ
১০ টি
২০০.০০/সেচ
২০০০.০০
৬. কীটনাশক ঔষধ


১০০০.০০
৭. পরিবহন


৩০০০.০০
খ. মোট ব্যয়


২২৫৫০.০০
সর্বমোট ব্যয় (ক+খ)
২৯৫৫০.০০
মোট আয়
২৫ কেজি/গাছ
২৫×৫৫০, ৬.০০ টাকা হারে
৮২৫০০.০০
নীট আয় (৮২৫০০.০০-২৯৫৫০.০০)
৫২৯৫০.০০
সূত্র: কৃষক মোঃ মাহাফুজার রহমান, পিতা: আকবর আলী প্রামানিক, গ্রাম: সেকেন্দ্রাবাদ নয়াপাড়া, ইউনিয়ন: রায়নগর, থানা: শিবগঞ্জ, জেলা: বগুড়া, তারিখ:০৪/০৯/২০০৭।

তথ্যসূত্র
১. পেঁপের উন্নত জাত ও উৎপাদন কলাকৌশল, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, জয়দেবপুর, গাজীপুর, জুন ২০০৬। ২. উচ্চমূল্য ফসলের উৎপাদন প্রযুক্তি (প্রশিক্ষণ মডিউল-২), ফল ও মসলা জাতীয় ফসল, নর্থওয়েষ্ট ক্রপ ডাইভারসিফিকেশন প্রজেক্ট, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫, মে, ২০০৬। ৩. কলা এবং পেঁপের প্রধান রোগসমূহ এবং তাদের দমন ব্যবস্হাপনা, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০১, ডিসেম্বর ২০০৪ । ৪. ‘পেঁপে চাষ’, কৃষি তথ্য সার্ভিস শক্তিশালীকরণ (২য় পর্যায়) প্রকল্প, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫। সেপ্টেম্বর, ২০০৬।

Author: atharabari

Md. Arifur Rahman Buhyan C/O : Azizur Rahman Buhyan Atharabari, Ishwargonj Mymensingh, Dhaka

5 thoughts on “পেঁপের চাষ

  1. উপকারী পোস্ট। শেয়ার করার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।।

  2. জালে ইলিশ দেখে এবং আপনার ব্লগের ইনফরমেশন দেখে খুশি হলাম।

  3. সার প্রয়োগ এর ব্যপার টা …… ভাল করে বুঝিয়ে বলবেন

  4. ভালো

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s