আঠারবাড়ী

সঞ্চয় ও সহযোগিতা, কৃষি ও ব্যাবসা সংবাদ

ঝুঁকি নেয়া শিখতে হবে

মন্তব্য দিন

ঝুঁকি নেয়া শিখতে হবে

কারণ, not taking a risk now can be the most risky decision you have ever made.

প্রিন্সটনে এসে শুরু থেকেই শেখার কোনো সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইনি। নিয়মিত ল্যাবের কাজের বাইরে নানান সেমিনার আর কর্মশালায় হাজির হতে চেষ্টা করি। পিএইচডি এবং পোস্টডকদের জন্য আয়োজিত সেরকমই একটা কর্মশালায় গিয়ে উপরের ঐ কথাটি শুনে একটু চমকে উঠলাম। এভাবে ভাবা হয়নি কখনো।

গুরুজনেরা সত্যই বলেন, ফাঁকিবাজির কোনো বেইল নাই। যেটা পরীক্ষাপাশের জন্য দরকার হয়নি, সেটা বাস্তবতার ঠ্যাকায় পড়ে ঠিকই জীবনের কোনো না কোনো সময় অনেক পোড় খেয়ে শিখতে হয়, হচ্ছে কিংবা হবে। তাই এখন যতটুকু পারা যায় ফাকিবাজি কম করতে চেষ্টা করি। তবে এই আপ্তবাক্য আক্ষরিক অর্থে নিলে আবার সমস্যা। তাহলে কেবল কলুর বলদের মত খাটতে হয়। সবাই কি কেবল এক পা এক পা করে হেটেই হিমালয় জয় করে? দেয়ার মাস্ট বি সাম ইন্টেলিজেন্ট ওয়ে আউট।

তবে তার জন্য চাই সাহস। ঝুঁকি নেবার জন্য যতটুকু সাহস প্রয়োজন ততটুকু, কিংবা তার চেয়েও বেশি।

এইসব কথা সবাই জানেন। আমিও জানতাম। কিন্তু নতুন করে যেটা জানলাম সেটা হচ্ছে, গোটা বিশ্ব জুড়ে যে মহামন্দার ঢেউ লেগেছে তার ফলে এখন কেউই আর নিরাপদ নয়। এমন কঠিন সময়ে ঝুঁকি নেয়াটা শুধু সাহসের ব্যাপার না, আরো অনেক কিছু। এখন ঝুঁকিই জীবন, টিকে থাকতে হলে।

ভাগ্য ভালো যে পিএইচডি করেছিলাম। এখন নাকি ফিনান্সিয়াল কোম্পানিগুলো এমবিএ খেদিয়ে পিএইচডি ঢোকাচ্ছে নিয়মিত, অন্তত নিজের চোখে গত তিন মাসে যা দেখলাম তাতে ব্যাপারটা সত্যি বলেই মনে হলো। সেদিন মাত্রই বায়োইনফরমেটিক্সের উপর পিএইচডি পেয়েছে এমন একজনকে জিঙ্গাসা করলাম, তো চাকরি করতে যাচ্ছেন কোথায়? বলেন, একটা মিডিওকার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাকাল্টি ওফার ছিল, কিন্তু যাচ্ছি ওয়াল স্ট্রিট। আমার মুখ হা হয়ে গেছে দেখে সে হেসে বললো, মজার ব্যাপার কি জানো, আমার চাকরিটা আসলে আগে এমবিএ’র লোকজন করতো। কিন্তু কোম্পানির কর্তারা গত দুই বছরে ধরা খেতে খেতে বুঝে গেছে যে চুলে জেল মেখে যারা অফিস করতে আসে তাদের দিয়ে এই মহাপ্লাবন থেকে উদ্ধার পাওয়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে পিএইচডি ডিগ্রিধারীরা সাধারণতো জটিল সমস্যা সমাধানে বেশ পটু হয়, অন্তত তারা জানে কিভাবে এগুতে হবে, সেই প্রশিক্ষণ তাদের থাকে -তো এইসব ভেবে ঝুঁকিটা নিয়েই ফেললাম।

এরকম উদাহরণ অনেক। মোদ্দা কথা হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই এখন আর গতানুগতিক ব্যাপারস্যাপারগুলো টিকে থাকছে না। ডাক্তারি পাশ দিয়ে অনেকে ব্যবসায় নামছেন, পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে অনেকে খাবারের দোকান খুলছেন, আবার অনেকে পুরোদস্তুর পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণা করছেন যদিও গ্রাজুয়েশন করেছিলেন সাহিত্যে। বিষ্ময়কর হলেও সত্যি।

মানুষ এখন নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ঝুঁকি নিতে চায়, পারে, কিংবা বাধ্য হয়। একটা চাকুরিই তো আর জীবনের সব কিছু নয়।

চাকুরি পেতেও ঝুঁকি নিয়ে মাঝবয়সে নিত্যনতুন জিনিস শিখতে হচ্ছে অনেককেই। দুনিয়া পাল্টাচ্ছে দ্রুত। এক সময় হয়তো নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদান করা বিলাসিতার পর্যায়েই পড়তো, কিন্তু এখন সেটাই হতে পারে টিকে থাকার অন্যতম অবলম্বন।

আমার ঝুঁকি নেয়ার ব্যাপারটা আলাদা।

সারাজীবন স্বপ্ন দেখেছি নিজে কিছু করবো, যা শিখেছি তা দিয়ে নিজেই নিজের ভবিষ্যত গড়বো। নিজের হাতে একটা প্লান্ট বানাবো, নিজের পরিকল্পনা, নিজের ডিজাইন, নিজের লোক, নিজের কাজ, দেশের কাঁচামাল, দেশের লাভ, নিজের স্বাবলম্বন। কিন্তু বাস্তবতা আমাকে বুঝিয়েছে, আরে সেটা মস্ত বড় বোকামি, বড় বেশি ঝুঁকি, এতে কোনো লাভ নেই।

কিন্তু ঐ কর্মশালায় বসে আমি হঠাৎ করে যেন নতুন এক জগত আবিষ্কার করলাম। এতদিন যে জুজুর ভয় আমি পেয়ে এসেছি সেই আসলে ত্রাণকর্তা, আর এতদিন যাকে আমি নিশ্চিন্ত মনে পায়ের নিচের শক্ত মাটি বলে জেনে এসেছি সেই আসলে খাদের কিনারা।

আরো বুঝলাম, একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সত্যিকারের সার্থকতা কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণে নয়, মানুষ যে মন দিয়ে চিন্তা করতে শেখে, যে চোখ দিয়ে নতুন আলোর সন্ধান লাভ করে সেই মনের, সেই চোখের দুয়ার খুলে দেয় বলেই না কোনো কোনো বিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠে।

আমার নিজের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা মনে পড়ে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আমাদেরকে এমনভাবে গড়ে তুলেছে যে আমরা সহজে ঝুঁকি নিতে চাই না। আমরা পাঠ্যবই থেকে দাগানো অংশ ঠাঠা মুখস্থ করে পরীক্ষা দিতে যাই, কখনো সিলেবাসের বাইরের অংশটুকু পড়ার পেছনে এতটুকু সময় ব্যয় করি না, কারণ সেটা করলে আমাদের ভালো ফলাফলকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে হয়। আমরা সেটা করতে চাই না। আমাদের শিক্ষকরা কখনো ঝুঁকি নিয়ে পাঠ্যবইয়ের বাইরের জগতের পাঠ আমাদের দেন না। আমাদের বাবা-মায়েরা কখনো ঝুঁকি নিয়ে তাদের ছেলেমেয়েকে শিল্পী, খেলোয়াড়, নাট্যকার, কবি, ইতিহাসবিদ, কৃষক, কিংবা বাবুর্চি হতে বলেন না। তারা বলতে পারেন না তোমাদের যা মন চায় কর। আমরাও কেবল ডাক্তার আর ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই, পড়তে চাই কেবল কম্পিউটার প্রকৌশল কিংবা ব্যবসা প্রশাসন, কারণ তাহলেই একটা চাকরি নিশ্চিত হয়। আমরা সবাই স্বপ্ন দেখি এক, হতে চাই আরেক, হই অন্য আরেককিছু।

কিন্তু এরকম তো হবার কথা নয়। আমি আমার স্কুল কিংবা কলেজকে দোষ দেই না। যে মাস্টারমশাইয়ের নিজের বেতন দিয়ে মাস চালানো দায়, যাকে সংসার চালাতে শিক্ষকতার বাইরেও নিজের জমিতে হালচাষ করতে হয়, টিউশনি করে অন্যের ছেলেকে পড়িয়ে তারপর নিজের ছেলের পড়ার খরচ জোগাতে হয়, তার কাছে থেকে ততোটা আশা করাও ঠিক না। কিন্তু আফসোস, আমি যে কলেজে পড়ছি সেই কলেজও আমার স্কুলের মতই আমাকে ঝুঁকি না নিতে শিখিয়েছে, গ্রেড-রেজাল্ট-নিয়ম-কানুন-টোফেল-জিআরই এতসব কিছুর চাপে-প্রলোভনে-ভয়ে আমরা ঝুঁকি নিতে ভুলে গেছি, আমাদের ভুল করে ভুল পথে যাবার স্বাধীনতা আমরা বিকিয়ে দিয়েছি একটা সার্টিফিকেটের কাছে।

আমাদের শিক্ষালয়গুলো যদি নাও শিখায়, তবু আমাদেরকে ঝুঁকি নিতে শিখতে হবে। অর্থনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক।

Author: atharabari

Md. Arifur Rahman Buhyan C/O : Azizur Rahman Buhyan Atharabari, Ishwargonj Mymensingh, Dhaka

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s